नारायणं नमस्कृत्य नरं चैव नरोत्तमम् ।

देवीं सरस्वतीं व्यासं ततो जयमुदीरयेत् ॥

প্রবেশchevron_right

আমাদের কথা

নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী

মহাভারতের কথা উঠলেই মহাভারতের অন্তর্গত এই সর্বজনবিদিত শ্লোকটি পণ্ডিত সজ্জনেরা উচ্চারণ করে বলেন – এই মহাভারত নামের ইতিহাস আগের কবিরাও অনেক বর্ণনা করেছেন, এখনকার অনেক কবিরাও এই ইতিহাস এখন বলে চলেছেন এবং ভবিষ্যতের কবিরাও বলবেন এই মহাভারতের কথা –

আচখ্যু কবয়ঃ কেচিৎ সম্প্রত্যাক্ষতে পরে।
আখ্যাস্যন্তি তথৈবান্যে ইতিহাসমিমং ভুবি।।

বস্তুত এই শ্লোকটিই বিদেশী-স্বদেশী শত শত পণ্ডিত-গবেষকদের মনে সেই প্রসিদ্ধ ইন্ধনটুকু জুগিয়েছে, যাতে প্রক্ষেপের নিন্দাপঙ্কটুকু খুব সহজেই মহাভারতের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া গেছে। দেশ তখন স্বাধীন হয়নি, দেশী পণ্ডিতরা ইয়োরোপীয় তাত্ত্বিকতার তর্কযুক্তিতে বেশ মোহিত বোধ করেছেন। এ অবস্থায় মহাভারতের শরীর-ব্যবচ্ছেদ আরম্ভ হয়েছিল। আঠেরো পর্ব ঘেঁটে ঘেঁটে এখান থেকে ওখান থেকে শ্লোক তপোদ্ধার করে এনে তাঁরা বলতে লাগলেন – এগুলি প্রক্ষিপ্ত, এগুলি পরে ঢোকানো হয়েছে। কত কত অধ্যায় জুড়ে বর্ণিত কাহিনী পর্যন্ত তাঁরা বাদ দিয়ে দিলেন। বললেন – এগুলি ক্ষেত্রবিশেষে মহাভারতীয় বস্তুর সঙ্গে বেমানান, অতএব প্রক্ষিপ্ত।

আমরা মহাভারতের এই হেনস্থা মেনে নিতে পারিনি। যে কবি নিজেই কথারম্ভে বলছেন – আগেও এই ইতিহাস লোকে বলেছে এবং এখনও বলছে, পরেও বলবে, সেখানে বেশ খানিকটা সময় জুড়েই যে এই মহাভারত–কথা সংকলিত হয়েছিল এবং কিছু কিছু কথা যে এখানে সময়ের অনুরোধে নির্মথ্যমান মহাভারত-শরীরের প্রসাধনী হিসেবে কাজ করেছে, সেটা নতুন করে গবেষকরা কী শোনাবেন! কিন্তু নতুন করে তাঁরা যেটা করলেন, সেটা হল – মহাভারত-শরীরের যেখানে সেখানে হাত দিয়ে বলতে লাগলেন – এই শ্লোক প্রক্ষিপ্ত, এই অংশ প্রক্ষিপ্ত, এই কাহিনী প্রক্ষিপ্ত, এই অধ্যায়গুলি প্রক্ষিপ্ত। আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম – এই প্রক্ষেপগুলির বয়স বলা যাবে কখনও, বস্তুত এই প্রক্ষেপগুলির কোনটা কত কালের পুরাতন, সে হদিশ গবেষক-মহোদয়দের দেবার ক্ষমতা নেই। বিশেষত সেই পুরাতনটাকেও যখন কোনোভাবে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর পরে এনে ফেলতে পারছেন না, সেখানে এই সমুদ্রবৎ গভীর-গম্ভীর কথাবস্তু নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করার আহ্লাদ কতিপয় গবেষকের আত্মলাভ ঘটাতে পারে বটে, কিন্তু তাঁরা এটা ভেবে দেখেন না যে, প্রক্ষেপও কিন্তু অন্যতর গুরুত্বপূর্ণ সময়ের এক সামাজিক বিবরণ দেয় এবং সেগুলি যে কোনোভাবেই হেয় নয়, তা এইরকম একটা চলমান কথ্য বাংলার প্রবাদ থেকেই প্রমাণিত হয় – তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হল!

আসলে কোন দৃষ্টিতে আপনি মহাভারতকে দেখছেন, তার ওপরেই আপনার ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে। মহাকবি লিখেছেন -- ‘সেই কলঙ্ক নিন্দাপঙ্কে তিলক টানি /এলেম রানি।’ আমরা প্রক্ষেপবাদের নিন্দাপঙ্কে তিলক টেনে এটাই ঠিক করেছি যে, মহাভারতের একটা ‘আনকাট’ সংস্করণ আমরা তৈরি করবো এবং তা বাংলায় একটা জনবোধ্য অনুবাদও করবো। সবচেয়ে বড়ো কথা, লক্ষশ্লোকী মহাভারতের অরণ্যের মধ্যে বার বার যে হাহাকার ওঠে – শ্লোকটা তো খুঁজে পাচ্ছি না। শ্লোকের দ্বিতীয় পংক্তি মনে আছে, প্রথম পংক্তি মনে নেই – কী করে খুঁজে পাবো – তার জন্য আমরা এমন একটা বর্ণানুক্রমিক শব্দসূচী তৈরি করেছি, যা এই বাংলায় শুধু কেন, ভারতবর্ষের কোনো সংস্করণে নেই। এমনকী এই শ্লোকারণ্যের মধ্যে শব্দমুক্তা খোঁজার ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র বাংলালিপিতে লেখা পঞ্চানন তর্করত্ন কিংবা হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের মহাভারতীয় সংস্করণগুলিই আমাদের একমাত্র উপজীব্য হবে না, আমরা পুণে থেকে ১৯২৯ সালে বেরোনো চিত্রশালা প্রেসের ছাপা মহাভারতের পাঠও যেমন খেয়াল করবো, তেমনই ১৯০৬ সালে বেরোনো নির্ণয়সাগর প্রেসের ‘বম্বে এডিশন’ও আমরা খেয়াল করবো। কেননা বম্বে থেকে বেরোলেও এই সংস্করণ কিন্তু দক্ষিণ ভারতীয় মহাভারতের পাঠগুলি ধারণ করে রয়েছে। কেন এমন করবো, তার কারণটা খুব পরিষ্কার। মহাভারতকে কেন এমন একটা মহৎ এবং বৃহদাকারে সাজাতে চাইছি, তার প্রথম কারণটা আমরা- রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবির দৃষ্টি দিয়ে বোঝাতে চাইবো।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন –

মনে পড়ে ভারতবর্ষে বেদব্যাসের যুগ, মহাভারতের কাল। দেশে যে বিদ্যা, যে মাননধারা, যে ইতিহাসকথা দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত ছিল এমন–কি দিগন্তের কাছে বিলীনপ্রায় হয়ে এসেছে, এক সময় তাকে সংগ্রহ করা তাকে সংহত করার নিরতিশয় আগ্রহ জেগেছিল সমস্ত দেশের মনে। নিজের চিৎপ্রকর্ষের যুগব্যাপী ঐশ্বর্যকে সুস্পষ্টরূপে নিজের গোচর করতে না পারলে তা ক্রমশ অনাদরে অপরিচয়ে জীর্ণ হয়ে বিলুপ্ত হয়। কোনো-এক কালে এই আশঙ্কায় দেশ সচেতন হয়ে উঠেছিল; দেশ একান্ত ইচ্ছা করেছিল, আপন সূত্রচ্ছিন্ন রত্নগুলিকে উদ্ধার করতে, সংগ্রহ করতে, তাকে সূত্রবদ্ধ করে সমগ্র করতে এবং তাকে সর্বলোকের ও সর্বকালের ব্যবহারে উৎসর্গ করতে। দেশ আপন বিরাট চিন্ময়ী প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষরূপে সমাজে স্থিরপ্রতিষ্ঠ করতে উৎসুক হয়ে উঠল। যা আবদ্ধ ছিল বিশেষ বিশেষ পণ্ডিতের অধিকারে তাকেই অনবচ্ছিন্নরূপে সর্বসাধারণের আয়ত্তগোচর করবার এই এক আশ্চর্য অধ্যবসায়। এর মধ্যে একটি প্রবল চেষ্টা, অক্লান্ত সাধনা, একটি সমগ্রদৃষ্টি ছিল। এই উদ্যোগের মহিমাকে শক্তিমতী প্রতিভা আপন লক্ষ্যীভূত করেছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় মহাভারত নামটিতেই। মহাভারতের মহৎ সমুজ্জ্বল রূপ যাঁরা ধ্যানে দেখেছিল ‘মহাভারত’ নামকরণ তাঁদেরই কৃত। সেই রূপটি একই কালে ভৌমণ্ডলিক রূপ এবং মানস রূপ। ভারতবর্ষের মনকে দেখেছিলেন তাঁরা মনে। সেই বিশ্বদৃষ্টির প্রবল আনন্দে তাঁরা ভারতবর্ষে চিরকালের শিক্ষার প্রশস্ত ভূমি পত্তন করে দিলেন। সে শিক্ষা ধর্মে কর্মে রাজনীতিতে সমাজনীতিতে তত্ত্বজ্ঞানে বহুব্যাপক। তারপর থেকে ভারতবর্ষ আপন নিষ্ঠুর ইতিহাসের হাতে আঘাতের পর আঘাত পেয়েছে, তার মর্মগ্রন্থি বার বার বিশ্লিষ্ট হয়ে গেছে, দৈন্য এবং অপমানে সে জর্জর কিন্তু ইতিহাসবিস্মৃত সেই যুগের সেই কীর্তি এতকাল লোকশিক্ষার অবাধ জলসেকপ্রণালীকে নানা ধারায় পূর্ণ ও সচল করে রেখেছে। গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে তার প্রভাব আজও বিরাজমান। সেই মূল প্রস্রবণ থেকে এই শিক্ষার ধারা যদি নিরন্তর প্রবাহিত না হত তা হল দুঃখে দারিদ্র্যে অসম্মানে দেশ বর্বরতার অন্ধকূপে মনুষ্যত্ব বিসর্জন করত। সেইদিন ভারতবর্ষে যথার্থ আপন সজীব বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি।

জ্ঞানের একটা দিক আছে, তা বৈষয়িক। সে রয়েছে জ্ঞানের বিষয় সংগ্রহ করবার লোভকে অধিকার করে, সে উত্তেজিত করে পাণ্ডিত্যের অভিমানকে। এই কৃপণের ভাণ্ডারের অভিমুখে কোনো মহৎ প্রেরণা উৎসাহ পায় না। ভারতে এই যে মহাভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যুগের উল্লেখ করলেম সেই যুগের মধ্যে তপস্যা ছিল; তার কারণ ভাণ্ডার-পূরণ তার লক্ষ্য ছিল না; তার উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন চিত্তের উদ্দীপন , উদ্‌বোধন, চারিত্রসৃষ্টি। পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের যে আদর্শ জ্ঞান কর্মে হৃদয়ভাবে ভারতের মনে উদ্ভাসিত হয়েছিল এই উদ্যোগ তাকেই সঞ্চারিত করতে চেয়েছিল চিরদিনের জন্য সর্বসাধারণের জীবনের মধ্যে, তার আর্থিক ও পারমার্থিক সদগতির দিকে, কেবলমাত্র তার বুদ্ধিতে নয়।।